মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পর্যটন ও ঐতিহ্য


মাগুরাজেলাব্র্যান্ডিংকর্মপরিকল্পনা

 

.ভূমিকা

বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত দেশে রূপান্তর করার লক্ষ্যে রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এই লক্ষ্য অর্জনে পর্যটন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বর্তমান জাতীয় আয়ের অন্যতম একটি উৎস পর্যটন শিল্প। নদী, বাওড় বেষ্টিত মাগুরা জেলায় পর্যটন শিল্পের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। মাগুরার অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পুরাকীর্তির প্রাচুর্য, সংস্কৃতি এ জেলাকে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকৃষ্ট করবে। মধুমতি, গড়াই, ফটকি নদীসহ অন্যান্য নদীর তীরবর্তী মনোরম পরিবেশ, সিরিজদিয়া বাওড়, রাজা সীতারামের রাজবাড়ী, ডাঃ লুৎফর রহমান, ফররুখ আহমদ, কবি কাজী কাদের নওয়াজের বাসভবন, শ্রীপুর জমিদার বাড়ী, নদের চাঁদের ঘাট, ভাতের ভিটা পূরাকীর্তি ইত্যাদি মাগুরা জেলাকে পর্যটন ব্র্যান্ডিং এর মাধ্যমে সবার কাছে পরিচিত করছে। বাংলাদেশ তথা বিশ্বে একমাত্র কাত্যায়নী পূজার মেলা হয় এই মাগুরাতে। এই মেলা উপলক্ষে লক্ষাধিক দর্শনার্থী এ জেলায় আসে। অন্যান্য দেশের পর্যটকদের এ জেলায় আনতে এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মধুমতি নদীতে বাৎসরিক নৌকাবাইচ দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ। এ নদীতে রিভার ক্রুজেরও সুযোগ রয়েছে। মাগুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক নির্দশনসমূহকে কাজে লাগিয়ে বিপুল দেশী বিদেশী পর্যটককে আকর্ষন করা সম্ভব। জেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন ধারণাকে স্বাগত জানাতে কিছু মানুষের দ্বিধা ইত্যাদি কতিপয় প্রতিবন্ধকতা স্বত্ত্বেও সকল পর্যায়ের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাগুরা জেলার পর্যটন সম্ভাবনা মাগুরা তথা সমগ্র দেশের অর্থনীতির কাক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনবদ্য ভূমিকা রাখবে।

২। মাগুরা জেলার ইতিহাস, পর্যটন আকর্ষণ সমূহ

 

মাগুরা জেলার ইতিহাস

আজকের যেখানে মাগুরা জেলা শহর গড়ে ওঠেছে প্রাচীন কাল থেকেই স্থানটি গুরুত্ববহ ছিলো।কখন থেকে মাগুরা নাম হয়েছে তার সঠিক হিসেব মেলানো কষ্টকর। মাগুরা প্রাচীন আমলের একটি গ্রাম। মাগুরা দু’টি অংশে বিভক্ত ছিল। মহকুমা সদরের পূর্বে মাগুরা ও পশ্চিমে ছিল দরি মাগুরা। দরি শব্দের অর্থ মাদুর বা সতরঞ্জি।দরি মাগুরায় মাদুর তৈরি সম্প্রদায়ের লোক বাস করতো বলে নাম হয়েছিল দরি মাগুরা।

মাগুরা এক কালে সমতটের অধীনছিল। সমতটের অধীনে যাবার পূর্বে মাগুরা শহরের ও পর দিয়ে গঙ্গা নদের প্রবাহ ছিল।তবে এই প্রবাহের নাম কি ছিল জানা যায় না।মাগুরা জেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক নদীর প্রবাহ ছিল। ঐতিহাসিক হান্টার উল্লেখ করেছেন বৃহত্তর যশোর জেলায় এককালে ৩৬ টি নদী ছিল।যশোর জেলার অংশ বিধায় মাগুরা অঞ্চলে অনেক নদী থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মাগুরা নামের মধ্যে বৈষয়িক অবস্থার একটি ইতিহাস সজীব হয়ে আছে। মাগুরা নামকরণের ক্ষেত্রে নদী বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। মাগুরার বুক চিরে এক কালে প্রবল প্রতাপে প্রবাহিত ছিল নবগঙ্গা। এর রূপ এত ভয়ঙ্কর ছিল যে, লোকে গঙ্গা নদীর সাথে তুলনা করে নবগঙ্গা নাম রেখেছিল। বড় দিয়ার পরে নবগঙ্গার রূপও বিশালতা আরো ভয়ঙ্কর ছিল।সামান্যবাতাসহলেইবড়দিয়ারপরথেকেনদীতেভীষণঢেউহতো।তাই এই অংশে নবগঙ্গার নাম দেয়া হয় কালীগঙ্গা।কালীগঙ্গানদীতেমগদেরআস্তানাছিল।মগরামাগুরাএলাকায়এসেওআখড়াগেড়েছিল।ধর্মদাসনামেজনৈকমগআরাকানথেকেএসেআজকেরমাগুরাশহরথেকেউত্তরপূর্বকোণেরসোজাসুজিগড়াইনদীরতীরেখুলুমবাড়িমৌজাসহ সংলগ্ন অঞ্চল ­­

রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী

 

মাগুরা জেলা শহর হতে ১০ মাইল পূর্বে মধুমতি নদীর তটে মাগুরা জেলায় অবস্থিত মহম্মদপুর উপজেলা। এই মহম্মদপুর উপজেলা শহর এলাকায় ছিল রাজা সীতারামের রাজধানী ও বাসস্থান। এটা বৃহত্তর যশোরের একটি গৌরবের স্থান। এই মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী ছিল।

 

মহম্মদপুরে সীতারামের বহু কীর্তি আজিও বিদ্যমান আছে। এর মধ্যে প্রাচীন দুর্গ, রাম সাগর, সুখ সাগর ও কৃষ্ণসাগর নামে দীঘি, দোল মঞ্চ ও রাজভবনের ধ্বংসাবশেষ সিংহদরওজা, মালখানা, তোষাখানা, দশভুজা মন্দির, লক্ষ্মী নারায়ণের অষ্টকোন মন্দির, কৃষ্ণজীর মন্দির প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অতীতে এই দুর্গের চর্তুদ্দিকস্থ খাত দিয়া মধুমতির স্রোত প্রবাহিত হইতো। সীতারামের দুইটি প্রধান বড় কামানের নামকরণ হইয়াছিল কালে খাঁ ও ঝুম ঝুম খাঁ। রামসাগর দীঘিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৫০০ ফুট ও প্রস্থে ৬০০ ফুট। এর জল এখনও প্রায় নির্মল ব্যবহারোপযোগী আছে। কৃষ্ণসাগর দিঘীটি মহম্মদপুর দুর্গের দক্ষিণ পূর্ব দিকে কানাই নগর গ্রামে অবস্থিত।

 

শ্রীপুর জমিদার বাড়ী

শ্রীপুর উপজেলা সদরের ১ কি.মি. এর মধ্যে পাল রাজার রাজপ্রাসাদের ধ্বংশাবশেষ রয়েছে। এখানে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন সারদারঞ্জন পাল চৌধুরী। শ্রীপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জমিদারীর আওতাধীন এলাকা ছিল। শ্রীপুর জমিদার বাড়ির বিশাল প্রাসাদতুল্য মন কাড়ার মত দৃষ্টি নন্দন বাড়ি এখন বাড়ির প্রবেশদ্বার তথা সিংহদ্বার ভগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। জমিদারীর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় নবাব আলীবর্দ্দি খার নিকট হতে এ জমিদারী খরিদ করা হয়। বৈবাহিক সূত্রে বাংলার বারো ভূইয়ার অন্যতম যশোরের মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সংগে সারদারঞ্জন পাল চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যের সংগে জমিদার সারদারঞ্জন পাল চৌধুরীর মেয়ে বিভাপাল চৌধুরীর বিবাহ হয়েছিল। এ সূত্র ধরে মহারাজ প্রতাপাদিত্য শ্রীপুরে এসেছিলেন। আরো জনশ্রুতি আছে এ বিভাপাল চৌধুরীকে কেন্দ্র করে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‌বৌঠাকুরানীর হাট' উপন্যাস রচনা করেন।

কাত্যায়ণী উৎসব

কাত্যায়ণী পূজা মাগুরা জেলার ঐতিহ্য।শারদীয়া পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার এক মাস পরেই কাত্যায়ণী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটা নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকল স্তরের এই মানুষ এই পূজা ও উৎসব উপভোগ করে। কাত্যায়ণী পূজা মাগুরার হিন্দু সমাজের জন্য প্রধান উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয় এখানে এটা এত জাঁকজমকের সাথে উদযাপন করা হয় যে, উপমহাদেশের কোথাও এইভাবে উদযাপন করা হয় না। দূর্গাপুজার এক মাস পরেই এ পূজা উদযাপন করা হয়।

মাগুরা সদরের পারনান্দুয়ালী গ্রামের ধর্ম পরায়ণ ধনাঢ্য ব্যক্তি প্রয়াত সতীশ চন্দ্র সরকার স্বপ্নদ্রষ্ট্র হয়ে১৯৫৩ সালে মাগুরায় প্রথম এই পূজা জাঁকজমকভাবে শুরু করেন। এরপর থেকে মাগুরায় হিন্দু সমাজে এই পূজা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কাত্যায়ণী ব্রত পূজা হিসেবে মাগুরার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব এবং মাগুরার ঐতিহ্য মনে করা হয়, তবে এর সীমাবদ্ধতা কেবল মাগুরার মধ্যে নয় ভারত ও নেপালের ধর্ম পরায়ণ লোকের কাছে এই পূজা খুবই আকর্ষণীয়।